সর্বশেষ খবর

10/recent/ticker-posts

আত্মহত্যা কেন - শিরিন শবনম।।BDNews.in


তরুণ প্রাণের আত্মহত্যার বিষয়টি সব সময়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অল্পতেই অনেকে মুষড়ে পড়ে।

- টিচার বা মা বকা দিয়েছে : আত্মহত্যা।

- প্রেম ফাঁকি দিয়েছে : আত্মহত্যা।

- রেজাল্ট খারাপ হয়েছে : আত্মহত্যা

- চাকরি জীবন ভাল যাচ্ছে না : আত্মহত্যা।

- পাওনাদার চোখ রাঙাচ্ছে : আত্মহত্যা।

পরিবারের অনাদর, অবহেলা বা সামাজিক বৈষম্যতা জিন বাহিত আত্মহত্যা প্রবণতাকে অদম্য করে তোলে। পরিবার সহমর্মি হলে শত বৈষম্যতায়ও প্রিয় জীবন কেউ ত্যাগ করতে চাইবে না। একটি দম্পতির দায়িত্ব আর্থিক মানসিক বিষয়গুলো আমলে এনে একটি বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনার জন্য নিজেদেরকে উপযুক্ত ভাবতে পারলেই একটা বাচ্চা পৃথিবীতে আনার মত মহৎ দায়িত্ব নেয়ার কথা ভাবা। আমাদের দেশের মত পিছিয়ে থাকা দেশের মানুষদের কাছে যা কোন গুরুত্বই পায় না।

আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক সময় জিন বাহিত হয়। কোনো সচেতনতা দিয়েই জিন বাহিত এই প্রবণতাটি সমূলে উৎপাটন করা যায় না। কিন্তু মানসিক শিক্ষায় উন্নত হলে এই প্রবণতা এই দেশের প্রেক্ষাপটে অনেকটাই হ্রাস করা যায়। কারণ অনুন্নত দেশের মানুষেরা উন্নত দেশের মানুষদের মত অতি সুখে বা শখে আত্মহত্যা করে না। একটি আত্মহত্যা একটি পরিবারের বিপর্যয়।

আমাদের দেশের মত অনুন্নত অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থার শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের দেশে মানুষগুলো প্রায়ই ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে যায়।

নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়া তৈরি না করেই বিয়ে করে ফেলে।

অনেকেই নিজেকে, জীবনকে বুঝে উঠার আগেই - অথবা দুইজন অসম মেধা, মনন, রুচির মানুষ নিজেদের মধ্যের অদৃশ্য বা দৃশ্যমান ফাটল দূর করতে তড়িঘরি করে বাচ্চা নিয়ে আসে পৃথিবীতে। অনেক ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যেই। তাদের নিজেদের বা পরিবারের ধারণা একটা নিষ্পাপ দেবতুল্য মানব শিশু তার অপার্থিব শক্তি দিয়ে ফাটল বন্ধ করে মজবুত করবে নারী পুরুষের বেঁকে যাওয়া সম্পর্ক।

অনেকক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে ঠিক হয়েছে বলে মনে হয়। আসলে সেটা কম্প্রোমাইজ! বাচ্চার সাথে মায়ের সম্পর্ক নাড়ির হওয়ার কারণে এই কম্প্রোমাইজটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর তরফে হয়। তবে পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সেক্রিফাইস বা কম্প্রোমাইজ শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা করতে পারে না। কারণ বাহ্যিক কোন কিছু আত্মিক ফাটল দূর হয় না। দু'জন অসুখি নারী পুরুষ তাদের সন্তানের মুখ চেয়ে বা সন্তানের মায়ায় নিজেদের আত্মার মৃত্যু মেনে নেয় চোরা হাসিতে মুখ ভরায় - নিজেদের বঞ্চনা মেনে নেয়। একমাত্র আশা - তাদের সন্তানটির কোন ক্ষতি না হোক।

জীবনকে শুধুমাত্র পাশ মার্ক দিয়ে সন্তানকে কেন্দ্র করে আধ খাচড়া কেটে যায় দুইটি মানুষের অসুখী জীবন। তারা মেনে নেয়, মানিয়ে নেয়। তাদের নিজেদের জন্য ভিন্ন কিছু পাওয়ার থাকতে পারে এটা অনেকে জানেনা - অনেকে জানতে চায় না। সবার ধারণা, বাবা মা নিজেদের মত থাকতে চেয়ে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিলে তা শিশুটির জন্য বেদনাদায়ক হবে। এটা সত্যি। তবে সন্তানটি একদিন বড় হয়। খুঁজে নেয় তার নিজের জীবন। কিন্তু ততদিনে দুইটি মানুষের জীবন প্রান্ত সীমায় পৌঁছে যায় জীবনের এক বিশাল অপচয়ের সাক্ষী হয়ে। এটাও একপ্রকার আত্মহত্যাই।

সন্তানকে যদি বোঝানো যায় একটি অসফল বিয়ে বা সম্পর্ক থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া এক উপহার "তুমি" (সন্তানটি) তাহলে সেই সন্তান নিজেকে আর অবহেলিত ভাবে না।

সে বুঝবে, তার বাবা মা ভিন্ন দুইটি সত্তা যাদের আছে আলাদা আলাদা সমস্যা, সুখবোধ, দুঃখবোধ!

তখন ওই সন্তান বাবা মাকে ভালবাসতে শিখবে।

আর সন্তানকে এটা শেখানো বাবা মায়েরই দায়িত্ব।

পরিবার, সমাজ, সন্তান - সবকিছুর প্রতি দায়িত্বশীল থাকা মানুষের মানবিক দায়িত্ব কিন্তু নিজেকে ভালবাসা, নিজের প্রতি সদাচরণ করা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। যে নিজের প্রতি সদয় না হতে পারে সে অপরকে কী দিবে?

এসব সত্ত্বেও আমাদের মত শিক্ষা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা অধিক জনবহুল অধ্যুসিত একটি দেশের অনুন্নত বোধের সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের একটি সংসার খুব প্রয়োজন জীবন যাপনের জন্য। ভালবাসাহীন বা অধিকারবিহীন হলেও তো একটা সংসার! মাথা গোঁজার ঠাঁই ! অনেকের জন্যই এই কঠিন সত্য প্রযোজ্য বা অনিবার্য।

নিজের জীবন নিয়ে লড়াইয়ে উপযোগী না হলেও বা ইচ্ছা- অনিচ্ছায় পরাজয় মেনে নিলেও সন্তানকে ভবিষ্যতের কঠিন জীবনের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রত্যেক বাবা-মায়ের দায়িত্ব। আবেগ, সংবেদনশীলতা মানুষের মানবীয় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু জীবনের কঠিন বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আবেগের বাইরে থেকে নেয়ার শিক্ষা সন্তানকে শিশু বয়স থেকেই দেয়া বাবা মায়ের দায়িত্ব। যে যত সঠিক ভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে - তার সন্তান তত বেশি উপযুক্ত হয়ে বড় হবে। আত্মহত্যা প্রবণতা রোধ হবে।

এর বাইরেও কিছু আত্মহত্যা আছে - যা শরীরি নয়, হৃদয়িক। আত্মার হত্যা। কিছু মানুষ অতি আবগে ছোট একটা অপ্রাপ্তিকে বড় করে করে জীবনকে গুঁড়িয়ে দেয়। দুঃখ বিলাসী হয়। কাছের চন্দ্রপ্রভাকে ফেলে কাঞ্চন জংঘা খুঁজে। তারা বেঁচে থাকে মৃত আত্মা সঙ্গী করে। এ ও এক প্রকার আত্মার হত্যাই। অথচ একটি মাত্র জীবন। বিপুল তার প্রাপ্তির সম্ভাবনা। একটি ঘাসের ডগায় যদি থাকে একটি শিশিরবিন্দু তবে কেন বাউলা মনে নিজেকে হারিয়ে খোঁজা?

জীবনের অধিকার পূর্ণ ভোগ তো একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। আমরা আমাদের অধিকারগুলো নিজেরা জানি না, সন্তানকেও শেখাতে পারি না। নিজেরা আত্মাহুতি না দেয়া এবং সন্তানকে তার জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব। তার আগে দায়িত্ব নিজের সুশীল, প্রেমময় জীবনের মূল্য বুঝতে পারা।

একটি জীবন ধরিত্রী মায়ের একটি ফুল। মহাকালের গর্ভে একটি ফুল মাত্র একবার জন্মায়। অনেক অমূল্য এ জীবন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ